রাত ৮:০৭,সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

রুপকথার “রুপকথা” ও বাস্তবতা

দৈনিক বাংলা পত্রিকাঃ আনিন মাহমুদুল

নানা মিডিয়ার প্রচারনায় হয়তো আপনার ইতোমধ্যে “ওয়াসিক ফারহান রুপকথা” নামক এক বিস্ময় বালকের নাম শুনেছেন । রুপকথার নাম আমি প্রথম দেখি কোন এক পত্রিকায়, রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট এ সবচেয়ে কম বয়সী প্রোগ্রামার হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট দেখে । দেখে আমার ভালো লাগে, আমাদের দেশের একটি কমবয়সী বাচ্চা এত অল্প বয়সে প্রোগ্রামিং করছে এবং সেটা স্বীকৃতি পেয়েছে ভাবলে কার না ভালো লাগে? আমার ধারনা ছিলো বাচ্চাটি হয়তো কোন একটি সহজ সরল প্রোগ্রামিং ভাষায় (যেমন: পাইথন) এ হয়তো ছোট খাটো প্রোগ্রাম লিখতে পারে, যেমন যোগ, বিয়োগ, গুন কিংবা ভাগ করার প্রোগ্রাম । আমরা যারা প্রোগ্রামিং জানি, তারা কিন্তু সবাই এরকম সিম্পল প্রোগ্রাম লিখেই শেখা শুরু করি । ৬ বছরের একটি বাচ্চাকে একটু ট্রেইন আপ করলে এরকম ছোট খাটো প্রোগ্রামিং শেখানো খুবই সম্ভব । তাই রুপকথার কাহিনী আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়নি, বরং ভালো লেগেছিলো । এরপর জানলাম রুপকথা সরকারী পুরস্কার পেলো একটি বেশ বড় অংকের । আবারো ভালো লাগলো যে সরকার এই জায়গাটিতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে । একটি সম্ভবানময় বাচ্চার প্রোগ্রামিং শেখাকে পুরস্কৃত করছে । সরকারে প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিলো এই ঘটনার পর । কিন্তু খটকা লাগা শুরু হয় যখন আমি রুপকথার উপরে আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়া শুরু করি । কোন কোন প্রতিবেদনে দাবী করা হয়েছে রুপকথা C, C++, Python সহ বেশ কিছু হাই লেভেল ল্যাঙ্গুয়েজে সে সমানভাবে পারদর্শী । খটকা লাগার কারন আমি এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রফেশনালি কাজ করছি প্রায় ৭ বছর ধরে, আমি জানি এই ল্যাঙ্গুয়েজগুলো শিখতে কি ধরনের মানসিক পরিপক্কতার প্রয়োজন হয় । বিশেষ করে C তে কাজ করতে গেলে আপনার পয়েন্টার এবং মেমোরী ম্যানেজমেন্ট এর মত বিষয়গুলো নবীন প্রোগ্রামারদের বেশ ভোগায় । সেখানে ৬ বছরের একটা বাচ্চা C তে প্রোগ্রামিং করতে পারে এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় । এছাড়া যারা পাইথন জানেন, তারা জানেন এর হোয়াইটস্পেইস বেইজড ইন্ডেন্টেশন এ অভ্যস্ত হতে বেশ সময় লাগে । একটা নির্দিষ্ট লেভেলের ম্যাচিউরিটি ছাড়া এই জিনিসটা রপ্ত করা মোটেই সহজ নয় । আমি চূড়ান্তভাবে অবিশ্বাস করা শুরু করি যখন দাবি করা হয় রুপকথা গেইম ডেভেলপ করতে জানে । গেইম ডেভেলপমেন্ট টা কতটা কঠিন সেটা বুঝতে আপনাকে গেইম ডেভেলপার হতে হবে না, নিয়মিত গেইম খেলেন এমন যে কেউ বুঝতে পারবেন । ধরুন এ্যাংরি বার্ডস এর কথাই । আপনি পাখিটিকে কোন এ্যাংগল এর কতটুকু টেনে ছেড়ে দিলে সে কোন বক্র পথে কতদূর পৌছাবে – এটা নির্নয় করতে আমাদের ফিজিক্স এর জ্ঞান লাগবে । আমার যতদূর মনে পড়ে আমরা নবম দশম শ্রেনীর পদার্থ বিজ্ঞান বইয়ে প্রথম এই ধরনের গানিতিক হিসাব করতে শিখি । আমার বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হয় যে ৬ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে নবম দশম শ্রেনীর ফিজিক্স কিংবা ম্যাথ জানে । ধরলাম রুপকথা আরও সিম্পল গেইম ডেভেলপ করে, সেখানে ফিজিক্স এর কোন বালাই নেই । ধরি সে সিম্পল ওয়ার্ড বেইজড পাজল গেইম (যেমন: হ্যাংম্যান) ডেভেলপ করতে পারে । সেক্ষেত্রেও কিন্তু তার মূল লজিকের পাশাপাশি ইউজার ইন্টারফেইস তৈরি করারও একটা ব্যাপার থাকছে । গেইম ডেভেলপমেন্টের একটা বেশ কঠিন কাজ এই ইউজার ইন্টারফেইস তৈরি করা । তাই রুপকথার গেইম ডেভেলপমেন্ট এর কাহিনী আমার কাছে রুপকথার মতই মনে হয়েছে । এরপর আমার চোখে পড়ে সাঈদ ভাইয়ের লেখা । উনি রুপকথার সাথে দেখা করেন এবং তার দক্ষতা যাচাই করেন । উনি উনার পর্যবেক্ষন থেকে স্পষ্টতই উল্লেখ করেন যে রুপকথা পড়তে পারেনা, লিখতে পারে না, অংক করতে পারে না । সে শুধু দেখে দেখে টাইপ করতে পারে । এখন আমি যদি একটি পাইথন প্রোগ্রাম লিখে আমার ক্লাস সিক্স পড়ুয়া ছোট ভাইকে দিয়ে বলি দেখে দেখে টাইপ করে রান বাটন চাপতে, তাহলে কিন্তু সে প্রোগ্রামার হয়ে যাবে না । রুপকথার বেলায়ও এমনটিই ঘটছে । সে দেখে দেখে হয়তো টাইপ করতে পারে, এরপর সেটাকে রং চং মাখিয়ে তাকে প্রোগ্রামার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে । সাঈদ ভাই তার লেখায় আরও উল্লেখ করেছেন রুপকথা সি তে “হ্যালো ওয়ার্ল্ড” ও কম্পাইল করতে পারে না । না পারারই কথা । ৬ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে কম্পাইলেশন কি জিনিস এটা বোঝার কথা নয় । এবার আসি রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট এর কাহিনীতে ।

রুপকথার পরিবার থেকে এই স্ট্রিপটি প্রকাশ করা হয় প্রমান হিসেবে । কিন্তু রিপ্লিজ এর অফিশিয়াল ওয়েব সাইটে ঢুঁ মারুন – http://www.ripleys.com/ – রুপকথার নাম লিখে খুজুঁন । কিছুই পাওয়া যায় না । কারন টা কি? কারনটা বুঝতে হলে আপনাকে এই কমিক স্ট্রিপটি ভালো করে পর্যবেক্ষন করতে হবে । রুপকথার কাহিনীর নিচে দেখুন লেখা আছে – “Submitted By Cynthia Farheen Risha, Dhaka, Bangladesh” এবং ডান পাশের উপরের স্টোরির ঠিক নিচে লেখা আছে – www.gocomics.com – আমাদের অনেক পত্রিকায় যেমন রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট থেকে ছোট ছোট সেকশন প্রকাশ করে, এই ওয়েবসাইটটিও সেরকম একটি সেকশন রেখেছে – http://www.gocomics.com/ripleysbelieveitornot । মজার ব্যাপার হলো এই সেকশনের নাম রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট হলেও এখানে তারা রিপ্লিজ ছাড়াও ব্যবহারকারীদের পাঠানো নানা সাবমিশন ছাপিয়ে থাকে । রুপকথার ঘটনাটাও তাই । রুপকথার মা, সিনথিয়া ফারহিন রিশা, তিনি এই স্টোরি সাবমিট করেন এবং সেটি তারা প্রকাশ করে যাচাই বাছাই না করেই । যেমন: এই স্ট্রিপটিতে তারা বানোয়াট একটা কাহিনী পাবলিশ করেছে – http://www.gocomics.com/ripleysbelieveitornot/2011/03/30 – এই স্ট্রিপের ডান পাশে উপরে Horace Canally নামক একজন দাবি করেছে যে ঘন্টায় ১০০ মাইল বেগে গাড়ি চালাতে থাকলে ২৮ বছরের বেশী সময়ে যেই দূরত্ব অতিক্রম করা যায়, তাতে আমরা পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র Proxima Centurai এ পৌছাতে পারবো । যেটা আসলে অবাস্তব । কারন ২৮ বছর ধরে ১০০ মাইল বেগে গাড়ি ক্রমাগত চালালেও আমরা এই নক্ষত্রের ধারে কাছেও যেতে পারবো না । অথচ এই ওয়েব সাইট কোন ভেরিফিকেশন না করেই সেটি ছাপিয়ে দিয়েছে । অর্থাৎ এই ওয়েব সাইটটি রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট সেকশনে রিপ্লিজ এর অফিশিয়াল সোর্স ছাড়াও সাধারন ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া অবাস্তব, অবৈজ্ঞানিক এবং কাল্পনিক কাহিনী শেয়ার করে । এদের বাকি স্ট্রিপ গুলো ঘেটে দেখলে আরও প্রমান পাওয়া যাবে । এই ঘটনার সারমর্ম: রুপকথার মা, একটি ওয়েব সাইটে রুপকথার কাহিনী শেয়ার করেন । তারা সেটি রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট সেকশনে, ব্যবহারকারীদের পাঠানো কাহিনী হিসেবে প্রকাশ করে । এবং সেক্ষেত্রে তারা কে সাবমিট করেছেন তার নাম উল্লেখ করে যাতে বোঝা যায় এই কাহিনী গুলো রিপ্লিজ এর অফিশিয়াল সোর্স থেকে আসে নাই । এ থেকে পরিস্কার বোঝা যায় রুপকথার পরিবার যেটা দাবি করেছে সেটা সত্য নয় । রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট এ কখনোই রুপকথার নাম ওঠেনি । উঠেছে এক কমিক ওয়েবসাইটের রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট সেকশনে, যেখানে তারা এরকম বানোয়াট কাহিনী নিয়মিত শেয়ার করে । অনুরুপভাবে, গিনেস বুক অফ ওয়ার্লড রেকর্ডস এও রুপকথার কোন কাহিনী পাওয়া যায় না – http://www.guinnessworldrecords.com/ আমার কাছে অবাক লাগে আমাদের দেশের সাংবাদিকদের অবস্থা দেখে । তারা একবার চেকও করে দেখেননি রুপকথার এই কাহিনী । ডেইলি স্টারের মত পত্রিকায় রুপকথাকে নিয়ে ফিচার করা হয়েছে । অথচ একটুও যাচাই বাছাই করা হয় নি । কিছুদিন আগে এক সাংবাদিক ভাইয়ের সাথে এই বিষয়ে কথা বলছিলাম । উনার অনলাইন পোর্টালেও একই ধরনের নিউজ শেয়ার করা হয় । উনার এক কলিগ সেই রিপোর্ট করেছিলেন । কাহিনী বুঝিয়ে বলার পর উনারা রাজি হন রুপকথাকে সবার সামনে এনে ভেরিফাই করার জন্য কিন্তু রুপকথার পরিবার রাজি হয় নি । যেমনি করে তারা এখনো সাঈদ ভাইয়ের দেওয়া চ্যালেন্জ গ্রহন করে প্রমান করেনি রুপকথার সত্যিকারের পটেনশিয়াল । রুপকথার পরিবার থেকে দুই একটা নিউজ এর সোর্স দেখানো হয় সেগুলোর বেশীরভাগই আমাদের এই উপমহাদেশের সাংবাদিকদের করা রিপোর্ট, যাচাই বাছাই না করেই লেখা “রুপকথা” ।আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি রুপকথার পরিবার রুপকথার মানসিক বিকাশ এর পথে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে । এবং তাদের এই মিথ্যা খ্যাতি অর্জনের ভিক্টিম হচ্ছে এই শিশুটি । সাম্প্রতিক কালের এক লেখার জন্য রুপকথার পরিবার রুপকথার এ্যাকাউন্ট দিয়ে সাঈদ ভাইকে নানা ধরনের গালি গালাজ করেছে, সেখানে বলা হয়েছে সাঈদ ভাই শিশু নির্যাতন করছেন, সাইবার বুলিইং করছেন । কিন্তু বাস্তবতা হলো রুপকথার পরিবার তাদের খ্যাতির মোহে এই শিশুটির উপর নানা ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন । উনারা হয়তো একদিন বুঝতে পারবেন কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে যাবে । উনাদের প্রতি অনুরোধ, রুপকথার প্রতিভার প্রমান দিন বা না দিন, শিশুটা আপনাদেরই । এই শিশুর ভবিষ্যতটা নষ্ট করবেন না, তাকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে দিন ।

 
Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।