সন্ধ্যা ৬:৫০,সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

‘নারী নির্যাতনের চিত্র উদ্বেগজনক’

মাহমুদ সালেহীন খানঃ

সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীদের অবদান প্রশংসনীয়। অগগ্রতিতে তাদের অবদান বড় ভূমিকা রাখলেও ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি।

দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে, কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ঘরের ভেতরে নারীদের নিরাপদ হিসেবে ধারণা করা হয় কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। শুধু ঘর নয় ঘরের বাইরেও নারী নির্যাতনের এই চিত্রটি খুবই ভয়াবহ। নতুন বছরের শুরুতেই ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৯৮টি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গত সোমবার নারী নির্যাতনের এই চিত্র প্রকাশ করেছে। নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতাকে ২০১৯ সালের মানবাধিকারের জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খাতুন। মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালে নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ২১৯টি, ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ৭৩০টি, ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ৪৮৬টি, ২০১৪ সালে ১৯ হাজার ৬১৩টি, ২০১৩ সালে ১৮ হাজার ৯১টি, ২০১২ সালে ১৯ হাজার ২৯৫টি এবং ২০১১ সালে ১৯ হাজার ৬৮৩টি। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়ে যে নারীরা আইনের দ্বারস্থ হন, তাদের ৬৬ শতাংশই পারিবারিক সহিংসতার শিকার বলে তথ্য এসেছে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এক গবেষণায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরা (বিবিএস) ১২ হাজার ৫৩০ জন নারী নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ চালিয়ে নারী নির্যাতনের চিত্র তুলে আনে। এতে উঠে আসে ৬৫ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জরিপে আরো বলা হয় অধিকাংশ নারীকেই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হতে হয়েছে।

দেশের ২০ জেলায় পুলিশ, আদালত, এনজিও এবং জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামে (জেএনএনপিএফ) আসা ২৮০০ অভিযোগের ভিত্তিতে চালানো এ গবেষণায় দেখা যায়, ১৮০০ ঘটনায় নারীরা তাদের বাসগৃহেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যা মোট অভিযোগের ৬৬ শতাংশ।

মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, ‘নারীদের নির্যাতিত হওয়া বা বিচার না পাওয়ার তথ্য আমাদের বিস্মিত করে না, খুবই স্বাভাবিক এসব নির্যাতন। পিতৃতন্ত্র যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখনই সহিংসতা চালায়।’

আর নারীরা আইনি অভিযোগ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নারীরা সাধারণ একটি ডায়েরি করতে থানায় গেলেই কী সব আচরণের সম্মুখীন হতে হয় তা সবারই জানা। সেখানে নিরাশ হতে হয়; অভিযোগ না তোলার জন্য যতভাবে পারা সম্ভব বাধা দেয়া হয়।’

গবেষক আহমেদ ইব্রাহিম বলেন, ‘আমাদের কাছে নারী নির্যাতন বলতেই শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠে। অথচ অধিকাংশ নারীই নিজ গৃহে নির্যাতিত হচ্ছেন। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের বাইরেও অর্থনৈতিক, মানসিক ও পরিবারে দমন এবং নিয়ন্ত্রণে থাকাও নির্যাতন।’ ঘরের ভেতরেই নারীরা সবচেয়ে ‘অনিরাপদ’ মন্তব্য করে আহমেদ ইব্রাহিম বলেন,‘এখন পর্যন্ত কোনো আইনই এটা মানতে রাজি নয় যে বিয়ের পরও স্বামীর দ্বারা নারীরা ধর্ষণের শিকার হতে পারে।’ যৌতুক ছাড়া অন্য কোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে দেশে নারীর সুরক্ষায় সরাসরি কোনো আইন নেই বলেও জানান তিনি।

গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে কেবল ১ দশমিক ১ শতাংশ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। যারা অভিযোগ করেন, তাদের মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী নিজের পক্ষে বিচার পান। বাকি ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ অভিযোগ আদালতে খারিজ হয়ে যায়; অনেক ক্ষেত্রে শুনানিও করা হয় না।

অ্যাকশন এইডের গবেষণাপত্রে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত নারী নির্যাতন সংশ্লিষ্ট সংবাদের ৭৫ শতাংশই ধর্ষণসংক্রান্ত।

বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার (বিএমবিএস) মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের তথ্যমতে, ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫.১৭ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে।

এ প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল এ আইনের আওতায় সংঘটিত অপরাধের যথাযথ বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে ভুক্তভোগীদের রক্ষা করা। ২০১৩ সালে সরকার এ আইন সংশোধন করে আরো কঠোর করে কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায় অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার হার কম।

অ্যাডভোকেট সায়মা আক্তার জানান, আইনি প্রতিকার চাইলে কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় অপরাধীরদের বিচারের মুখোমুখি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার নারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যবস্থা নিয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় বাদীকে নিজস্ব কোনো আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯২ ধারা অনুযায়ী তিনি সরকারের পক্ষ থেকে আইনজীবী পাবেন। তিনি মামলার সব তত্ত্বাবধান করবেন। যদি বাদী নিজে আইনজীবী নিয়োগ দিতে চান তাহলে সেই আইনজীবী সরকারি আইনজীবীর অধীনে কাজ করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া আইনজীবীকে কোনো খরচ দিতে হবে না।

দৈনিক বাংলা পত্রিকা / রফিকুল ইসলাম খান

 
Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।